Sunday, 3 January 2016

গল্প (মোবাইল ভার্শন) : সাঁঝরাতের অন্ধকারে

সাঁঝরাতের অন্ধকারে
শিশির বিশ্বাস
এবড়োখেবড়ো মেঠো পথে গুরুপদ যখন তাঁর সাইকেল নিয়ে ভুবনডাঙার কাছে পৌঁছলেন তখন সন্ধে পার হয়ে গেছে। কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ উঠতে দেরি আছে এখনও। চারপাশে অন্ধকার ইতিমধ্যেই বেশ ঘন। হোগলডাঙার ওদিকে আজ না গেলেও চলত। গতকাল বিকেলে লাইব্রেরিতে নতুন কিছু বই এসেছে। সেগুলো এন্ট্রি করতে অনেকটা সময় লাগল। আজ তাই বেরোতে মানা করেছিল অনেকে। অনেকটা পথ।
কিন্তু অন্য ধাতের মানুষ গুরুপদ কান দেননি। মধুখালি গ্রাম পঞ্চায়েত বছর কয়েক হল গ্রামের মানুষের জন্য জনগ্রন্থাগার খুলেছে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। বইয়ের খোঁজে সারাদিনে একটি মানুষেরও দেখা মিলত না। আগে যিনি লাইব্রেরিয়ান ছিলেন, সারাদিন প্রায় শুয়ে বসেই কাটিয়ে দিতেন। আসলে আজকাল বই পড়ার চল এমনিতেই কমে গেছে। তার উপর এই অজ গ্রাম। চাষবাস, বাড়ির কাজ আর পেটের ধান্দাতেই দিন কেটে যায়। বই পড়ার সময় কোথায়?
কিন্তু গুরুপদ হার মানেননি। নতুন লাইব্রেরি। র‍্যাক ভর্তি নতুন বই এভাবে অব্যবহারে নষ্ট হয়ে যাবে, মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। শেষে দুপুর হলেই গোটাকয়েক বই সাইকেলের পিছনে চাপিয়ে গ্রামের বাড়ি-বাড়ি হানা দেওয়া শুরু করলেন। চাষিবাড়ির মানুষের ওই সময় কিছুটা হলেও অবসর। বিশেষ করে মেয়ে-বউরা। যাদের অক্ষর পরিচয় আছে, সামান্য লিখতে পড়তে পারে তাদের কাছে বাছাই করা বই পৌঁছে দিয়ে আসতেন। গোড়ায় খুব একটা সাড়া মেলেনি। কিন্তু অবস্থা পাল্টাতে দেরি হয়নি। বিশেষ করে বাড়ির মেয়েদের মধ্যে। আর তারই ফলশ্রুতি, এখন দম ফেলার ফুরসত নেই গুরুপদর। তাঁর বই ভর্তি সাইকেল এখন ছুটতে শুরু করেছে আশপাশের আরও গোটাকয়েক গ্রামে। আজ বই নিয়ে হোগলডাঙা যাওয়ার দিন। বেশ জানেন, গ্রামের অনেকেই হাঁ করে আছে তাঁর জন্য। তাই দেরি হলেও পরোয়া করেননি।
অন্ধকার ঘন হয়ে আসতে গুরুপদ একটু দ্রুতই প্যাডেল করছিলেন। আসলে জায়গাটা ভালো নয়। সীমান্ত অঞ্চল। সন্ধে নামলেই বিএসএফ নয়তো পুলিশের টহল শুরু হয়। পথে লোকজন তেমন বের হয় না। আজও ব্যতিক্রম নয়। এতটা পথ পার হয়ে এলেন, একটি মানুষেরও দেখা মেলেনি। পড়ন্ত বিকেলে শুনশান মাঠ খাঁখাঁ করছে। তবে সেজন্য চিন্তা হয়নি। এই ক’বছরে এখানে সকলেই তাঁর পরিচিত। তবে সীমান্ত অঞ্চল যখন, শুধু পুলিশ বিএসএফ কেন, সন্ধের পর আরও অনেকেরই আনাগোনা শুরু হয়। তাদের সবাই সমান নয়। বিশেষ করে এই ভুবনডাঙার খালের ধারটা। মাঠের শেষে সরু এক খাল। বর্ষা ছাড়া অন্য সময় তির্‌-তির্‌ করে জলের ধারা। পার হলেই ভিন দেশ।
খালের পাড় বরাবর মোরামের সরু এক মেঠো রাস্তা খানিক দূর গিয়ে সমকোণে বেঁকে বাঁশবেড়ে গ্রামের দিকে গেছে। এই জায়গাটা পার হলে খানিকটা নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। মোড়ের কাছে পৌঁছে গুরুপদ প্যাডেলে আরও জোর দিতে যাচ্ছিলেন, পিছনে খানিক দূরে পথের পাশে ঝাঁকড়া বাবলা গাছের দিকে হঠাৎ চোখ পড়তে থেমে গেলেন। অন্ধকারে একটা ছায়ামূর্তি নড়াচড়া করছে। কেমন সন্দেহজনক। বাবলা গাছটা আগেই পার হয়ে এসেছেন। অন্য কেউ হলে অযথা সময় নষ্ট না করে এগিয়ে যেতেন নিজের পথে। কিন্তু গুরুপদ ব্রেক চেপে দাঁড়িয়ে পড়ে হাঁকলেন, “কে? কে ওখানে?”
গোড়ায় কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। তবে গুরুপদর চোখ এড়াল না, অন্ধকারে ছায়াটা নড়ছে। মৃদু খড়্‌মড়্‌ শব্দ। তারপরেই আচমকা গা হিম করা খিল্‌খিল্‌ হাসি। হঠাৎই অন্ধকার ফুঁড়ে  একরাশ ঝকঝকে দাঁত বের করে ঝিলিক দিয়ে উঠল আস্ত একটা নরকঙ্কালের মাথা, “হেঁ-হেঁ, আমি।
নির্জন অন্ধকার রাতে এই প্রত্যন্ত প্রান্তরের মাঝে হঠাৎ ওই দৃশ্য দেখে দাঁত কপাটি লেগে যাওয়ার কথা। কিন্তু অন্য ধাতুতে গড়া গুরুপদ কিছুমাত্র দমলেন না। ভূতপ্রেতে কোনও দিনই বিশ্বাস নেই। বেশ জানেন, ওসব মনের ভুল ছাড়া কিছু নয়। পথের পাশে সাইকেল দাঁড় করিয়ে সাবধানে এগিয়ে গেলেন বাবলা গাছের দিকে।
খানিক এগোতেই সেই নরকঙ্কালের মুন্ডু বাবলা গাছের আড়ালে উধাও হয়ে গেল। তবু সাবধানে বাকি পথটা পার হয়ে কাছে এসে পৌঁছতে অজান্তেই একটা স্বস্তির নিশ্বাস পড়ল। বাবলা গাছের গোড়ায় ঝোপের আড়ালে মুখ খোলা একটা বস্তা পড়ে রয়েছে। অন্ধকারে চারপাশে যথাসম্ভব খুঁজেও অন্য কিছু দেখতে পেলেন না। সাবধানে বস্তাটা উল্টে দিতেই খড়মড় শব্দে একরাশ নরকঙ্কালের হাড়গোড় ছড়িয়ে পড়ল মাটিতে।
হঠাৎ এক মতলব খেলে গেল গুরুপদর মাথায়। দেরি না করে ধীরে-ধীরে ফিরে এলেন সাইকেলের কাছে। রাস্তা ধরে বাঁশবেড়ের দিকে খানিক এগিয়ে একসময় মাঠে নেমে পড়লেন। তারপর এক ঝোপের পাশে সাইকেল রেখে নিঃশব্দে প্রায় গুঁড়ি মেরে ফের এগিয়ে গেলেন সেই বাবলা গাছের দিকে।
কিছুটা ঘুরপথ। তাই সময় লাগল। তবে উদ্দেশ্য ব্যর্থ হল না। কাছে যেতেই দেখতে পেলেন, গাঢ় অন্ধকারে বাবলা গাছের তলায় খালি গায় লিকলিকে ছোটখাট একটা মানুষ ঢাউস সেই বস্তাটা পিঠে নিয়ে সবে উঠে দাঁড়িয়েছে। সরে পড়বে এখনই। দেরি না করে গুরুপদ ছুটে গিয়ে দুহাতে জাপটে ধরলেন তাকে।
আঁক্‌!বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে অস্ফুট শব্দে প্রায় আঁতকে উঠল লিকলিকে মানুষটা। বস্তা ফেলে ছিটকে প্রায় বেরিয়েও পড়েছিল। কিন্তু গুরুপদও কম যান না। তাই সুবিধা করতে পারল না।
কে রে তুই?” কড়া গলায় গুরুপদ প্রশ্ন করলেন।
আজ্ঞে আমি নন্দ। নাক কান মলছি এবারের মত ছেড়ে দ্যান।
কোন গ্রামে বাড়ি?”
আজ্ঞে, বাঁশবেড়ে।
ইতিমধ্যে পকেট থেকে একটা পেনসিল টর্চ বের করে গুরুপদ জ্বেলে ফেলেছেন। তাকিয়ে দেখলেন, হাতের মুঠোয় ধরা মানুষটি বয়সে একেবারেই নাবালক। বড়ো জোর বছর বারো। কৃশ রুগ্ন শরীর। খালি গা। পরনে তেলচিটে একটা হাফ প্যান্ট। তবে চিনতে পারলেন না। কিন্তু সেই স্বল্প আলোয় অপরপক্ষ ততক্ষণে চিনে ফেলেছে ওঁকে। মুহূর্তে একগাল হেসে বলল, “আরে আপনি লাইবেরি স্যার! আগে বলবেন তো। অন্ধকারে আমি ভাবলাম বিএসএফ। ওফ্‌! সেবার ক্যাম্পে নিয়ে কী পেটানটাই না পিটিয়েছিল। কিন্তু সে ওই একবার। তারপর আর পারেনি।কথা শেষ করে ফের একগাল হাসল ছেলেটা।
বুঝেছি।বলতে গিয়ে গুরুপদ মৃদু হেসে ফেললেন। আর সেই থেকে কাছে ওদের কাউকে দেখলেই ওইভাবে বস্তা থেকে কঙ্কালের মাথা বের করে নাকিসুরে —–
ঠিক ধরেছেন।ফের হাসল ছেলেটা। অন্ধকারে ওই দেখে পালাবার পথ পায় না কেউ। কিন্তু আপনি যে অন্য রকম, জানব কেমন করে?”
ততক্ষণে সব পরিষ্কার হয়ে গেছে গুরুপদর কাছে। কানে আসে, ইদানীং নাকি এখান দিয়ে মানুষের কঙ্কালও চালান যাচ্ছে ওপারে। কলকাতা থেকে মাল আসে। সীমানা পার করতে পারলেই এক একটা কঙ্কালের দাম বেড়ে যায় চার-পাঁচ হাজার টাকা। এদিকের অনেকেই তাই ভিড়ে পড়েছে এই কাজে। কিন্তু তাদের মধ্যে দশ-বারো বছর বয়সের ছেলেছোকরাও যে রয়েছে ভাবেননি। ঢোঁক গিলে বললেন, “এই অন্ধকার রাতে একা নরকঙ্কালের বস্তা নিয়ে সীমানা পারাপার করিস! ভয় করে না?”
ভয় করবে কেন!ফের হাসল ছেলেটা। ও তো মরা জিনিস। তা বলেন যদি, বড্ড ভয় পাই ওই বিএসএফ-এর লোকজনকে। সেবার ধরা পড়ে শুধু বিএসএফ নয়, পিটুনি খেয়েছিলাম মহাজনের কাছেও। তা ছেড়ে দ্যান স্যার এবার। ঝপ্‌ করে মালটা ওপারে বুঝিয়ে দিয়ে ঘরে যাই।
ঘরে গিয়ে কী করবি?”
দুপুরের পান্তা আছে। খেয়ে শুয়ে পড়ব।চটপট জবাব এল।
কেন, লেখাপড়া করিস না?”
নাহ্‌।ঠোঁট বেঁকিয়ে মাথা নাড়ল ছেলেটা, “কেলাস ফোরের পর আর ইস্কুলে যাইনি। তারপর তো বাবাই ভিড়িয়ে দিলে এই কাজে।
এই এতক্ষণে সামান্য নড়ে উঠলেন গুরুপদ। অন্ধকারে নেচে উঠল চোখ দুটো। গম্ভীর গলায় বললেন, “তোকে ছেড়ে দিতে পারি। তবে এক শর্তে।
কী?” গুরুপদ দেখল, এই প্রথম গলার স্বর কেমন করুণ হয়ে উঠল ছেলেটার।
আমাকে চিনিস যখন, তখন ভালোই জানিস, গ্রামের সবাইকে ধরে ধরে বই পড়তে দিই আমি। তোকেও পড়তে বই দেব একটা।
অ্যাঁ বই!প্রায় যেন খাবি খেল নন্দ।
হ্যাঁ, বই। পড়ে সাত দিনের মধ্যে ফেরত দিয়ে যাবি। যদি রাজি থাকিস তো বল। নইলে বমাল নিয়ে হাজির করব বিএসএফ ক্যাম্পে। জানিস তো, ওদের ওখানেও যাওয়া-আসা আছে আমার।
নন্দর ভালোই জানা ছিল সেটা। খানিক চিন্তা করে শেষে ব্যাজার হয়ে বলল, “তাহলে দ্যান স্যার।
খানিক দূরে সাইকেলে বই রাখা ছিল। নন্দকে সঙ্গে নিয়ে গুরুপদ তার থেকে একটা বই বের করে গুঁজে দিলেন হাতে। মনে থাকে যেন। পড়ে সাত দিনের মধ্যে ফেরত দেওয়া চাই।
সময় বয়ে যাচ্ছে। নন্দ দেরি করল না আর। সট্‌ করে বইটা কোমরে গুঁজে ঘাড় নাড়ল সামান্য। তারপর বস্তা পিঠে তুলে নিয়ে মিলিয়ে গেল অন্ধকারে।
দিন পনেরো পরের কথা। সেদিন দুপুরে গুরুপদ লাইব্রেরি-ঘরে কাজ করছিলেন। হঠাৎ তাকিয়ে দেখেন সামনে দাঁড়িয়ে সেদিনের নন্দ ছেলেটা। চোখে চোখ পড়তেই কাঁচুমাচু মুখে বলল, “একটু দেরি হয়ে গেল স্যার।
খানেক পাতার বই। পড়াশুনো ছেড়ে দেওয়া ক্লাস ফোরের একটা ছেলে সে বই পড়তে দিন পনেরো লাগতেই পারে। গুরুপদ চোখ নাচিয়ে বললেন, “তা পড়েছিস তো বইটা?”
হ্যাঁ স্যার।একগাল হেসে ঘাড় নাড়ল নন্দ। তিন দিনেই শেষ করে ফেলেছি। টেরেজার আইল্যান্ডগল্পটা দারুণ স্যার!
ছেলেটার কথায় বুকটা ভরে গেল গুরুপদর। কিন্তু সেটা যথাসম্ভব চেপে বললেন, “টেরেজার নয় রে, ট্রেজার, মানে গুপ্তধন। তা তিন দিনে বইটা শেষ করেও পনেরো দিন পরে নিয়ে এলি যে বড়ো?”
কী করব স্যার।সামান্য মাথা চুলকে নন্দ বলল, “বন্ধুদের বলেছিলাম গল্পটা। শুনে সবাই তো হাঁ। কলিমও আমার মত কেলাস ফোর পর্যন্ত পড়েছে। ও পড়তে নিয়ে গেল। দিনচারেক বাদে ফেরত দিয়ে গেলেও বাকিরা ধরল পড়ে শোনাবার জন্য। তাই তো দেরি হয়ে গেল। জিম ছেলেটাকে বড্ড মনে ধরেছে সবার।
অন্ধকারে প্রায় হাতড়ে গুরুপদ সেদিন ট্রেজার আইল্যান্ড বইয়ের ছোটদের একটা সংক্ষিপ্ত অনুবাদ নন্দকে দিয়েছিলেন। এতটা একেবারেই আশা করেননি। এগিয়ে এসে ওর রুক্ষ মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “নন্দ, তুই কিন্তু সাহস আর মনের জোরে জিমকেও পিছনে ফেলে দিবি।
কিন্তু  লাইবেরি স্যারেরসেই প্রশংসায় নন্দর তেমন ভাবান্তর হল না। সামান্য মাথা চুলকে বলল, “একটা কথা বলব স্যার। আর একটা বই দেবেন আজ?”
ছবিঃ  শিবশংকর ভট্টাচার্য (সৌজন্য: জয়ঢাক)
প্রথম প্রকাশ: ‘টগবগ’ ১৪১৯ শারদীয়া সংখ্যা

3 comments: